কুঠিপাড়ার ৩০ টি চামড়া আড়তের মাঝে এখন মাত্র ৪ টি আড়ত টিকে আছে ঢিমে তালে ব্যবসায়ীরা চান সরকারের সহযোগিতা

0

স্টাফ রিপোর্টার : বিলীন হওয়ার পথে  জেলার চামড়া শিল্পের ব্যবসা, পাবনার কুঠিপাড়ায় পাকিস্থান আমল থেকে ব্যবসা পরিচালনাকারী ছোট বড় মিলিয়ে ৩০ টি চামড়া আড়তের মাঝে এখন রয়েছে মাত্র ৪ টি। এসব আড়তের মাঝে প্রায় ২০ ছিলো বড় আড়ত। মূলধন আটকে যাওয়ায় ও ক্রমাগত লস দেখে অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে অন্যপথ বেছে নিয়েছেন। ঢিমে তালে এখনও টিকে থাকা ব্যবসায়ীরা চান সরকারের সহযোগিতা।

পাবনা পৌর এলাকার কুঠিপাড়া মহল্লার এক সময়ে খ্যাতি ছিলো চামড়া ব্যবসার। ট্রাক ট্রাক চামড়া যেতো ঢাকার হাজারীবাগ, পোস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায়। পাকিস্থান আমল থেকেই এখানে গড়ে ওঠে চামড়ার আড়ত। পৈত্রিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বংশ পরম্পরায় উত্তরসুরীরাও জড়িয়ে যেতেন এই ব্যবসায়। তখন ছিলো সুদিন। অনেক টাকা বিনিয়োগ ও লেনদেন হতো এখানে। কোরবানী ঈদ আসলে এখানে হতো যেন অন্যরকম পরিবেশ। দিনরাত ব্যস্ততা ছিলো এখানকার ব্যবসায়ীদের। অবসর পেতো না কেউ। চামড়া ছিলা আর লবনজাত করতে দিন শেষে ঘোর রাত হয়ে যেতো, শেষ হতো না কাজের চাপ। এখন আর সেদিন নেই। ছোট বড় ৩০ টি চামড়ার আড়তের মাঝে এখন ঢিমে তালে মাত্র টিকে আছে ৪ টি আড়ত। এসব আড়তের মাঝে প্রায় ২০ ছিলো বড় আড়ত। পূর্বে গরুর চামড়া তারা বিপনন করতেন ১৮ শ থেকে ৩২ শ টাকা পর্যন্ত, কিন্তু এখন তা গড়তে গড়তে ঠেকেছে মাত্র ৮শ থেকে ১ হাজার টাকায়। ছাগলের চামড়া তারা কিনেছেন ২শ থেকে ২৫০ টাকা, কখন কখনও ২৭৫ টাকাতেও কিনেছেন, তা এখন নামতে নামতে এসে ঠেকেছে ৪০ থেকে ৬০ টাকাতে। চামড়া কিনে বহন করে নিয়ে আসবেন, শ্রমিক দিয়ে তা ছিলে প্রক্রিয়াজাত করে লবন দিয়ে মজুত করবেন। এতো কিছুতে দু:সাধ্য হয়ে যাচ্ছে তাদের কাছে। অর্থনীতিতে একটা নিন্মগামী মারপ্যাচে বড় সংকটে আছেন তারা। এসব ব্যবসায়ীদের টাকা আটকে গেছে বিভিন্ন স্থানে। তারা পরবর্তিতে এসব টাকা আর তুলতে পারেননি। ফলে কোনরকমভাবে যেন টিকে থাকার এক যুদ্ধ এখানকার চামড়া ব্যবসায়ীদের। লবনের দাম, শ্রমিকের মজুরী, চামড়া বহন সবকিছু মিলিয়ে খরচ মিটিয়ে লাভের মুখ দেখা মুশকিল হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

চামড়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী জানান, আট দশ বয়স থেকেই তিনি এই চামড়া ব্যবসা দেখছেন এলাকায়। বয়স বাড়লে পরে নিজেও এই ব্যবসার সাথে জড়িয়ে যান। প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কিন্তু এখনকার মতো এমন দুর্দিন কোনদিন দেখিননি। এখান থেকে হাজারীবাগ, পোস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় চামড়া যেতো। এখানকার ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা আত্মসাত করেছেন। ফলে অবস্থা এরকম হয়ে পড়েছে।

অপর চামড়া ব্যবসায়ী এস এম পারভেজ বিপুল জানান, এখন থেকে দশ বছর আগেও একটি গরুর চামড়া কিনেছেন ১৮ শ থেকে ২৮ শ টাকা অবধি। আর ছাগলের চামড়া কিনেছেন ২শ থেকে ২ শ ৫০ টাকা। এখন এমন অবস্থা গরুর চামড়া ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা আর ছাগলের চামড়া ৪০ থেকে ৬০ টাকা। অনেক সময়ে চামড়া কিনে গাড়ি ভাড়ার সমান সমান। এরকম হতে থাকলে পথে বসে যাবে এই ব্যবসায়ীরা।

চামড়া ব্যবসায় অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন এই ব্যবসা। এমনকি এক সময়ের প্রসিদ্ধ পাবনার কুঠিপাড়া চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির মূল নেতৃবৃন্দ ফজলুর রহমান, ইন্দু, আব্দুল হান্নান, আজাদ, জগলু, আজম, লুসাইসহ অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন এই চামড়ার ব্যবসা। তাদের বক্তব্য এতো লস টানা যায় না। আর কতো, এজন্য বহু বছরের এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে পথে বসার আগেই কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন অন্যপথ।

এক সময়ে চামড়া ব্যবসায় বেশ সুনাম হয়েছিলো ব্যবসায়ী তোজাম আলীর। কিন্তু আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতে এমন হয়েছে তার আর এখন পুঁজি বলে কিছু নেই। এজন্য অনেক কষ্ট করে শেষে মুদির দোকান দিয়েছেন এলাকায়।  চামড়া ব্যবসায়ীদের এখন মাথায় হাত। চামড়ার দাম না থাকায় দিন দিন সকলেই এই ব্যবসা ছেড়ে যাচ্ছেন। ট্যানারি থেকে মাল নিয়ে ঠিকমতো টাকা না দেওয়া, বছরের পর বছর টাকা ফেরতের জন্য ঘুরে ঘুরে হয়রানী এবং ক্রমাগত চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখায় এখন দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে। চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল হান্নান মিলন বলেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যবসায়ীদের যেসব টাকা বকেয়া পড়ে আছে তা যদি সরকারি উদ্যোগে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছা থাকলে এখানকার ব্যবসায়ীরা আবারো ঘুরে দাড়াতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছার মাধ্যমে চামড়া ব্যবসায়ীরা একটু সহায়তা পেলে ফের ঘুরে দাড়াতে পারে পাবনার কুঠিপাড়ার দীর্ঘ বছরের ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা চামড়া শিল্পের ব্যবসা। এমনটাই মনে করছেন এখানকার মানুষ।

Share.

Leave A Reply