সরকারি গেজেটে জাতীয় কবির স্বীকৃতির দাবি নজরুল পরিবারের

0

এনএনবি : মৃত্যুর ৪৪ বছর পরেও কাজী নজরুল ইসলামের জাতীয় কবির স্বীকৃতি সরকারি গেজেটে না আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কবি পরিবারের সদস্যরা।

কবির নাতনী খিলখিল কাজী বলেছেন, এভাবে চললে কয়েক যুগ পর নব প্রজন্ম জাতীয় কবিকে বিস্মৃত হতে পারে। সে কারণেই সরকারি গেজেটের মাধ্যমে জাতীয় কবির স্বীকৃতি হওয়া উচিৎ।

বাংলা ভাষার কবিতাপ্রেমিদের কাছে নজরুল প্রেমের কবি, চির যৌবনের দূত; সেইসঙ্গে তিনি বিদ্রোহী, গৃহত্যাগী বাউন্ডুলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (তৎকালীন পিজি হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় কবির। বৃহস্পতিবার ছিল তার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম।

বৈচিত্র্যময় এক জীবনের অধিকারী নজরুল ছেলেবেলায় পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘দুখু মিয়া’ নামে। পিতৃহীন কবি একে একে হারিয়েছেন কাছের স্বজনদের। আর্থিক অসচ্ছলতা তার জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল।

সব বাধা অতিক্রম করে একসময় তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা হয়ে ওঠেন। সাম্য ও মানবতার চেতনায় সমৃদ্ধ ছিল তার লেখনী। কবিতায় বিদ্রোহী সুরের জন্য হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’।

খিলখিল কাজী বলেন, “নজরুলের যে জীবন দর্শন ছিল, তার সৃষ্টি পাঠ করলে আমাদের যা চোখে পড়ে তা হল দেশকে ভালোবাসা, দেশের মানুষকে ভালোবাসা। কবি নজরুল শিখিয়ে গেছেন চির উন্নত শির হতে, মানুষকে ভালোবাসতে। অন্যায়, অবিচার কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি তার কলমকে মজবুত রেখেছিলেন।

“চির অকুতোভয় কবি ভয়ঙ্কর সে যুগে এককভাবে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। তার গান, কবিতা সবসময়ে সমাজ বদলানের হাতিয়ার। তিনি সকল বাঙালির, সকল মানুষের “

বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কবির সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান। সেখানে নজরুল সংগীত শিল্পী ফেরদৌস আরার কথায়ও জাতীয় কবির সরকারি স্বীকৃতির প্রসঙ্গটি আসে।

তিনি বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় কবি, তা আমাদের মেধায় আছে, মননে আছে। কিন্তু তা কোনো সরকারি গেজেটে নেই। অনেকের কথা থাকে- লিখিত রাখার কি দরকার আছে? আমরা তো জানিই যে তিনি জাতীয় কবি। সে কথাই যদি হত, তাহলে কোথাও কোনো স্বীকৃতির প্রয়োজন হত না। কোথাও কোনো কাগজে লিখতে হত না। স্বাক্ষর-সিলের কোনো দরকার ছিল না। কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় কবি সে হিসেবেই স্বীকৃতি হওয়া উচিৎ।

“স্বাধীনতার এত বছর পরেও, আজকে তার ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী, এত দিনেও আমরা তাকে স্বীকৃতি দিতে পারিনি, এ লজ্জা আমাদের সবার।”

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দলের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। আমাদের চেতনায় নজরুল চিরজাগরুক থাকবেন।

“তার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এই দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ বৃক্ষের মূলোৎপাটন করব বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। একইসাথে নজরুলের চেতনায় সমৃদ্ধি ও সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণ করব।”

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে কবির সমাধিতে এসেছিলেন সচিব বদরুল আরেফীন। পরে তিনি বলেন, “কবি নজরুল শুধু বিদ্রোহী কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন শান্তি ও সম্প্রীতির কবি। তিনি ছিলেন সমস্ত সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে। নজরুলের কীর্তি ও রচনা চর্চার মাধ্যমে আমরা আমাদের সাহিত্য অঙ্গনকে আরও এগিয়ে নেব।”

বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “যখন গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, তখন কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের উদ্বুদ্ধ করেন স্বেচ্ছায় নির্যাতন ভোগ করার। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত। দুঃশাসনের এ যুগে কাজী নজরুল আমাদের প্রতিটি ক্ষণে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছেন, এ দুঃসময়কে অতিক্রম করার জন্য, সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের পাশেই আছেন।

“তিনি আছেন বলেই এ নির্যাতন, নিপীড়নের মধ্যেও আমরা মিছিল করছি, সত্য উচ্চারণ করছি। তিনি আছেন বলেই আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করছি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, “ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে প্রেরণার এক অসাধারণ উৎস হিসেবে রয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের কঠিনতম সময়ে নজরুলের গান, কবিতা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। যখন তাকে ঢাকায় আনা হল, তখন বাংলাদেশ নামটির সঙ্গে নজরুলের নামটির মেলবন্ধন আরও দৃঢ় হল।

“আমরা যখন দুঃসময়ের মুখোমুখি হই, বাস্তবতার মুখোমুখি হই, তখনই কবির অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক ও মানবিক বোধসম্পন্ন সৃষ্টি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়।”

Share.

Leave A Reply