ঢাকার উন্নয়নে ‘ছেলেখেলা’ করতে দেওয়া হবে না: মেয়র তাপস

0

এনএনবি : ঢাকার উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ‘মহা পরিকল্পনা’ হাতে নিয়েছে জানিয়ে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, এই উন্নয়ন হবে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে, ঢাকা নিয়ে আর কাউকে ‘ছেলেখেলা’ করতে তিনি দেবেন না।

“মহা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা ঢাকাকে সচল সুন্দর ঢাকা হিসেবে, সর্বোপরি উন্নত ঢাকা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যে সকল সংস্থা ঢাকায় কাজ করে, তাদেরকে অনুরোধ করব, ঢাকাকেন্দ্রিক যে কোনো কার্যক্রম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে। আমরা সেটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করব।”

বৃহস্পতিবার নগর ভবনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন মেয়র।

ঢাকায় সেবাদানকারী অন্যান্য সংস্থার উদ্দেশে তিনি বলেন, “যে কোনো প্রকল্প হাতে নিলে আগে ডিএসসিসির সঙ্গে সমন্বয় করে নেবেন। যত্রতত্র অন্য কোনো সংস্থাকেৃ ঢাকাকে নিয়ে ছেলেখেলা করার সুযোগ দেওয়া হবে না।”

নতুন অর্থবছরের জন্য ৬ হাজার ১১৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১৩৬ শতাংশ বেশি।

গত অর্থবছরে দক্ষিণ সিটির সংশোধিত বাজেটের আকার ছিল ২৫৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

মেয়র তাপস তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, এবারের বাজেটে ‘বটম-আপ পলিসিকে’ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলর ও সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ১৯টি নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাজেটে মহা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কামরাঙ্গীরচরে একটি ‘সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ করার কথাও তিনি বলেন।

“একটি শহরের চারদিকে নদী বেষ্টিত, এমন শহর পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু বুড়িগঙ্গার সন্তান, আমাদের সকলের প্রাণের এই ঢাকা শহরের জনগণকে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকলেও তা সবসময় প্রদান করা সম্ভব হয়নি। তাই সহজতর ও কার্যকর উপায়ে নাগরিক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে আমরা মহাপরিকল্পনার আওতায় কামরাঙ্গীর চরে একটি সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট করতে চাই।”

উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ বন্ধের ওপর জোর দিয়ে শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, “বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার সমন্বয়হীনতায় শিল্পায়নের নামে অপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই নগরকে আমরা দিনে দিনে এক রুগ্ন স্বত্ত¡ায় পরিণত করে চলেছি। এটা সত্যি যে, দেশের অর্থনৈতিক এবং সামগ্রিক উন্নয়নে শিল্পায়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

“কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে মানুষের যেমন শিরা-উপশিরায় রক্ত প্রবাহ ও অক্সিজেন সঞ্চালন অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি একটি শহরের বেঁচে থাকা নির্ভর করে তার নর্দমা ব্যবস্থাপনা, শহরের বুক চিরে বয়ে চলা খাল, নদ-নদীর প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং দূষণ-দখল প্রতিরোধের ওপর।”

তাপস বলেন, “শিল্পায়ন ও নাগরিক সুবিধার নামে আমরা এই শহরের নদ-নদীগুলো দখল, দূষণ ও ভরাট করে চলেছি। জলাধারগুলো নিশ্চল-নিথর করতে সম্পন্ন করেছি সকল আয়োজন। যত্রতত্র ফেলছি ময়লা-আবর্জনা, গতি রোধ করছি নর্দমাগুলোর। এভাবে চলতে দেয়া সমীচীন নয়।”

এই সমন্বয়হীনতার দেয়াল ভেঙ্গে দখল-দূষণের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ গড়ে’, জলাশয়গুলোকে ‘সচল করে’, অপরিকল্পিত শিল্পায়নের বিরুদ্ধে ‘সরব হয়ে’ পরিবেশ-প্রতিবেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহŸান জানান দক্ষিণের মেয়র।

তিনি বলেন, নগরকে সবুজে ঢেকে দিতে জন-দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরত্বারোপ করার সময় এখন।

“তবেই আমরা ঢাকা শহরকে ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারব। আর জনগণ পাবে একটি বাসযোগ্য সুন্দর, সচল, সুশাসিত ও উন্নত ঢাকা।”

মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে দাবি করেন, ডেঙ্গু-চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ‘সফল হয়েছে’।

“আমি আড়াই মাস আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। আমি এখন বলতে পারি, আমরা অনেক অংশে সফল। সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এইডিস মশার প্রাদুর্ভাব বেশি থাকে। আমরা এখনও পর্যন্ত ঢাকাবাসীকে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছি।”

তারপরও মশা নিধনে নানা কর্মকাÐ চলছে জানিয়ে মেয়র বলেন, এই শহরে অনেক জলাশয় রয়েছে যা মশার প্রজনন ও বংশবিস্তারের ‘আঁতুড়ঘর’।

“এসব জলাশয় দখল-দূষণে নিশ্চল-নিথর হয়ে পড়ে আছে। ফলে জলাশয়গুলো আমাদের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার বদলে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ জলাশয় সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন নয়। এগুলোর মালিক সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা। নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঝুলে আছে সেসব ‘মশক-অভয়ারণ্যে’ আমাদের কার্যক্রম বাস্তবায়ন।”

তারপরও গত ১৪ জুন ডিএসসিসির ১০টি অঞ্চলের ১০টি জলাশয় পরিষ্কার করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, “সেখানে অবমুক্ত করেছি দেশীয় তেলাপিয়া মাছ, যা পানিতে ভাসমান মশকের লার্ভা খেয়ে বংশবিস্তার রোধ করে।

“আর বদ্ধ জলাশয়ে পানি স্থির থাকলে মশার বিস্তার ঘটে। সেজন্য পরিষ্কার করার পর আমরা জলাশয়গুলোতে হাঁস অবমুক্ত করেছি, যাতে হাঁসের চলাফেরার ফলে পানির উপরিভাগ স্থির না থাকে। এসব জলাশয়ে মাসে অন্ততে একবার জাল টানানো হবে। এতে করে মাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি মশক প্রজনন হ্রাস পাবে।”

ডিএসসিসি এলাকায় প্রায় দেড়শ কিলোমিটার নর্দমা উন্মুক্ত রয়েছে জানিয়ে তাপস বলেন, “এসব নর্দমা মশক প্রজনন ও বংশবিস্তারের ঘাঁটি। সেসব উন্মুক্ত নর্দমা পরিষ্কার করার কার্যক্রমও আমরা শুরু করেছি। এখন থেকে এসব নর্দমা মাসে অন্তত দুবার পরিষ্কার করার নির্দেশনা দিয়েছি।”

ময়লার কনটেইনার রাস্তায় নয়

ঢাকার রাস্তায় কোনো ময়লা ফেলা যাবে না জানিয়ে তাপস বলেন, “রাস্তায় ময়লা ফেরার কোনো সুযোগ থাকবে না, এমনকি ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যে সব ময়লার কনটেইনার ছিল, সেগুলোও রাখা হবে না।”

তার যুক্তি, কনটেইনারে বর্জ্য রাখা হলে তার পাশে রাস্তার ওপরেও ময়লার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৪টিতে অন্তর্বর্তীকালীণ বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে জায়গা নির্ধারণ করা হলেও নানা জটিলতায় তা আটকে ছিল।

“আশা করছি এই ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা ৩১টি ওয়ার্ডে এসটিএস নির্মাণে সফল হব। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে এসটিএস নির্মাণ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আমি ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছি।”

তিনি জানান, রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র থেকে আবর্জনা নিয়ে যাওয়া হবে মাতুয়াইলের ভাগাড়ে (ল্যান্ডফিল)। রাত ৯টা থেকে পরিচ্ছন্নকর্মীরা ঢাকা শহরের রাস্তাগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করবেন।

“রাস্তাগুলো পরিষ্কার করার পর প্রয়োজনীয়তা অনুসারে রাস্তায় পানি ছিটানো হবে এবং সকাল ৬টার মধ্যে একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে নগরী আমরা ঢাকাবাসীকে উপহার দিতে চাই।”

Share.

Leave A Reply