উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের চিত্র দুর্নীতি ও অনিয়মে প্রকল্পের ভবিষ্যত অনিশ্চিত

0

স্টাফ রিপোর্টার : প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে পাবনার চিত্র দুর্নীতি ও অনিয়মে ভরপুর। সরকারের এই সুন্দর কল্যাণমূলক প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে সংশ্লিষ্টদের নানামূখী পরিকল্পনাহীনতা ও দয়িত্বহীনতার কারনে। ফলে এই প্রকল্পের ভবিষ্যত এখানে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারের বড় বড় প্রকল্পের পাশাপাশি উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রাম পর্যায়ে অবহেলিত দু:স্থ, শিক্ষার সুযোগ থেকে বাইরে থাকা ও ঝড়ে পড়া শিশুদের জন্য উপ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন এনজিও দ্বারা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের এই গ্রামমূখী শিক্ষাকার্যক্রম গ্রহনের সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পায় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে। আউট অফ স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন প্রজেক্ট নামের এই প্রকল্পটি পাবনাতে পড়েছে মুখ থুবড়ে। দেশে মহামারীর কারনে সময়মতো প্রকল্পটি শুরু হয়নি, ঠিক সেই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে কাজ করতে না পারা অযোগ্য কিছু প্রতিষ্ঠানকেও এই প্রকল্পের কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ এনজিও গুলোর ভেতর থেকেই। পাবনাতে এই শিক্ষা প্রকল্পের কাজ পেয়েছে দিগন্ত সমাজ কল্যাণ সমিতি নামের একটি এনজিও। এই প্রকল্প ঘিরে এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালকের নানামূখী কাজের অনিয়মের বিরুদ্ধে এর আগে অধিদপ্তর থেকে তদন্ত করানো হয়। গেলো বছরের ১৩ ডিসেম্বর সেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম, বহির্ভুত লোকবল নিয়োগ, অফিস ছাড়া কার্যক্রমসহ অনেক বিষয় উঠে আসে সেই তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উপ পরিচালক মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত ৯ ফেব্রুয়ারি,২০২১ এ একটি পত্র দেওয়া হয় (স্মারক নম্বর-৩৮.০০.০০০০.৩০৪.১৪.৪২৩.২০২০-৫২) দিগন্ত সমাজ কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক শামসুন নাহার মুক্তাকে। সেখানে উল্লেখ করা হয় , তার সংস্থার বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর শিক্ষক-সুপারভাইজার চাকরি প্রত্যাশীদের পক্ষে সাঁথিয়া উপজেলা সড়কের মো. জিন্নাহ হোসেন পাবনা কর্তৃক মাঠ পর্যায়ে জনবল নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টরা আপনার সংস্থার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। একারনে নিয়োগ বাণিজ্যসহ অন্যান্য অনিয়ম প্রমামিত হওয়ায় আপনার বিরুদ্ধে কেনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে না,তা আগামী সাতদিনের ভেতরে মহাপরিচালক উপানুষ্ঠনিক শিক্ষা ব্যুরো বরাবর প্রদানের জন্য নির্দেশ করা হলো। এদিকে দিগন্ত সমাজ উন্নয়ন সংস্থার এই শিক্ষা প্রকল্পের এই কার্যক্রম ঘিরে স্বশরীরে তদন্ত করতে আসেন জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মহা: সাহারুজ্জামান। তিনি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন (স্মারক নং- জেউশিব্যু/ঢাকা/ এনজিও তদন্ত-৩৪৫/২০২০-১৬৩, তারিখ- ২৪/১২/২০২০)। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় আউট অব স্কুল চিল্ড্রেন এডুকেশন কর্মসূচি বাস্তবায়নে পাবনা জেলার জন্য নির্বাচিত লিড এনজিও দিগন্ত সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামসুন্নাহার মুক্তা শিক্ষক সুপারভাইজার নিয়োগের বিষয়ে জানান, বিγপ্তির মাধ্যমে সুপারভাইজার ও অন্যান্য স্টাফদের নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে তবে এখনও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। শিক্ষক নিয়োগের বিγপ্তি দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের জন্য ১৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সঠিক নয় বলে জানান। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, নির্বাহী পরিচালক শামসুন্নাহার মুক্তার কথার সাথে কাজের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। তিনি বারবার দাবি করেন পিপিআর অনুযায়ী নিয়োগ করেছেন, কিন্তু এধরনের কোনো দালিলিক প্রমান দিতে তিনি ব্যার্থ হয়েছেন। নিয়োগ পরীক্ষার ডকুমেন্ট যাচাইয়ে দেখা যায় যে, কোনো নিয়োগ কমিটি বা কমিটির রেজুলেশন নেই। দুটি নিয়োগ বিγপ্তি পাওয়া যায় ১ টি শিক্ষক নিয়োগের অন্যটি স্টাফ নিয়োগের, কিন্তু তাতে তার কোনো স্বাক্ষর ও স্মারক নম্বর থাকলেও তাতে তারিখ নেই। নিয়োগ কমিটি আছে কিনা সে বিষয়ে দিগন্তের পরিচালক জানান, জেলা পর্যায়ের সকল অফিসারদের নিয়ে নিয়োগ কমিটি আছে ও মিটিং হয়েছে। মিটিং এর রেজুলেশন ও স্বাক্ষরের কাগজ দেখতে চাইলে তিনি জানান ভার্চুয়াল মিটিং করেছেন। কিন্তু ভার্চুয়াল মিটিং আইডি দাখিল করতে বললে তিনি জানান, টেলিফোনে কথা বলেছেন। নিয়োগের একটি মৌখিক পরীক্ষার নম্বর সীট তিনি দাখিল করলেও উক্ত সীটে শুধু নির্বাহী পরিচালকের স্বাক্ষর রয়েছে সেখানে কোনো তারিখ বা অন্য কারো স্বাক্ষর নেই বিধায় তা গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে আরো জানান, সংস্থার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতারনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে মর্মে পরিলক্ষিত হয়। নির্দিষ্ট সংখ্যক আবেদন রেখে কিছু ভুয়া আবেদন/সিভি সংযুক্ত করে নাম কাওয়াস্তে ২৫ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা গ্রহনের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। প্রাপ্ত আবেদন থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চাকরি প্রার্থী সাঁথিয়ার মেহেদী হাসান সবুজের সাথে যোগাযোগ করে তদন্ত কমিটি জানতে পারে যে,সুপারভাইজার পদে চাকরি দেবার নামে তার কাছ থেকে দিগন্ত সমাজ উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক শামসুন্নাহার মুক্তা ১ লাখ টাকা নিয়েছে। তাকে বলা হয়েছিলো ২০ হাজার টাকা বেতন ও প্রজেক্টটি ১০ বছরের। পরবর্তিতে কথার সাথে কাজের মিল না পাবার কারনে মেহেদী হাসান টাকাটা ফেরত নিয়েছেন অনেক চেষ্টা করে। শাহজাহান নামের আরেকজনের সাথে কথা বললে তিনি জানান, তিনি কোনো ধরনের আবেদনই জমা দেননি ও দিগন্ত নামের এই এনজিও কে চেনেন না তিনি। বরং তিনিই তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেন ফোন নম্বর কোথায় পেলেন। পরে এনজিও এর নির্বাহী পরিচালকের নাম বললে তিনি জানান, ২০১২ সালে তিনি এই এনজিওতে স্যানিটেশন প্রজেক্টে চাকরির জন্য সিভি জমা দিয়েছিলেন। সেই সিভিটিই এখন বোধ হয় কাজে লাগাচ্ছেন তারা। সাইফুল ইসলাম নামের প্রার্থীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, সে বিএলপি প্রজেক্টে এই এনজিওতে কাজ করে। তার অধীন ২২ টি শিখন কেন্দ্র আছে (উল্লেখ্য,বিএলপিতে একজন সুপারভাইজারের অধীনে ১৫ টি কেন্দ্র,সুতরাং উক্ত সংস্থা বিএলপি-২ ফেজ প্রকল্পে কম সুপারভাইজার নিয়োগ দিয়েছে কিনা তা যাচাই করা উচিত)। সে আউট অফ স্কুল চিলড্রেন প্রকল্পে কোনো আবেদনই করেননি মর্মে জানান। অথচ সাইফুল ইসলামের সিভি তদন্ত কর্মকর্তার সামনে প্রদর্শন করা হয়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো হতে প্রাপ্ত সুত্রস্থ পত্রে সংযুক্ত অভিযোগপত্র যাচাই করে দেখা যায়, উক্ত পত্রে নিয়োগের জন্য ১৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা গ্রহনকারীর স্বাক্ষরের সাথে দিগন্ত সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামসুন্নাহার মুক্তার স্বাক্ষরের কোন মিল নেই। শুধু তাই নয়, উক্ত পত্রে উল্লেখিত টাকা প্রদানকারীদের কোনো ঠিকানা পাওয়া যায়নি বা সাধারন মানুষদের জিγাসা করলে তারা চেনেন না বলেও জানান। এসবেরই কারনে তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ দপ্তরে প্রেরণ করে তাতে লেখা রয়েছে : দিগন্ত সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামসুন্নাহার মুক্তার বিরুদ্ধে নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের প্রমান পাওয়া গেছে। যার প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এছাড়াও উল্লেখ করা হয় যে, সরকারের বৃহৎ এই কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দিগন্ত সমাজ উন্নয়ন সংস্থার স্বক্ষমতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে পরিলক্ষিত হয়। এজন্য পাবনা জেলাতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পার্টনার এনজিও’র সহযোগিতায় কর্মসূচি পালন করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। অন্যথায় সরকারের অর্থ অপচয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, যে সকল শর্ত মেনে এই কাজটি এই প্রতিষ্ঠান নিয়েছেন তার কোন ধরনের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিলক্ষিত হয়নি। আর একারনে গণমূখী জনকল্যাণী সরকারের এই শিক্ষা কার্যক্রম ভেস্তে যাবার পথে পাবনাতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র সমস্ত বিষয়ের আরো অধিকতর তদন্ত করে খতিয়ে দেখার আহবান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।

Share.

Leave A Reply