আসামে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়ারাই বানাচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্প

0

এফএনএস বিদেশ : আসামে ‘অবৈধ অধিবাসীদের’ জন্য নির্মাণাধীন একটি ডিটেনশন ক্যাম্পের কাজে নিয়োজিত অনেক শ্রমিকেরই চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে নাম নেই বলে জানা গেছে।গত সপ্তাহে ভারতের উত্তর-পূর্বের এ রাজ্যটিতে যে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যেই এ ডিটেনশন ক্যাম্প বা আটক কেন্দ্রগুলো বানানো হচ্ছে।এ নিয়ে আতঙ্কে থাকলেও শ্রমিকরা বলছেন, অর্থের জন্য বাধ্য হয়েই তারা এ ক্যাম্প বানাতে শ্রম দিচ্ছেন।ওই শ্রমিকরা ঘন জঙ্গল কেটে প্রায় সাতটি ফুটবল মাঠের সমান জমি প্রস্তুত করে ‘অবৈধ অধিবাসীদের’ জন্য গণআটক কেন্দ্রের ভবন বানাচ্ছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।আসামের গোয়ালপাড়া শহরের কাছে নদী তীরবর্তী দুর্গম এক এলাকায় ভারতের প্রথম এ গণআটক কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে।আসামের এ ডিটেনশন ক্যাম্পে অন্তত তিন হাজার জনকে রাখার ব্যবস্থা হচ্ছে। এখানে স্কুল, হাসপাতাল, বিনোদনের স্থান, নিরাপত্তারক্ষীদের বাসভবনের পাশাপাশি উঁচু সীমানা দেয়াল এবং ওয়াচ টাওয়ার থাকবে।   ক্যাম্পগুলো নির্মাণের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে এবং ক্যাম্পগুলোর লেআউট পর্যবেক্ষণ করে জেনেছে রয়টার্স।ক্যাম্পটি নির্মাণে জড়িত শ্রমিকদের অনেকেই জানান, আসামে অবৈধ অধিবাসী চিহ্নিত করতে গত সপ্তাহে যে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তাদের নাম নেই।যে কারণে এসব শ্রমিকদের বানানো ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে শেষ পর্যন্ত তাদেরও স্থান হতে পারে।শ্রমিকদের একজন শেফালি হাজং; নির্মাণস্থলের কাছাকাছি গ্রামের হাড্ডি-চর্মসার এ আদিবাসী নারীরও নাম ওঠেনি চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে।আরো প্রায় ২০ লাখ মানুষের মতোই তাকে এখন জন্মসনদ কিংবা জমির মালিকানা সনদের মত নাগরিকত্বের প্রমাণ স্বরূপ কাগজপত্র দাখিল করতে হবে; ব্যর্থ হলে নিজের হাতে বানানো ক্যাম্পগুলোর মতো কোনো না কোনো আটক কেন্দ্রে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।ভারত সরকারের মতে, আসামে প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে আসা লাখ লাখ অবৈধ অধিবাসী বসবাস করছে।অন্যদিকে ভারত কাউকে অবৈধ অধিবাসী ঘোষণা করলে তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ঢাকা।এমন পরিস্থিতির কারণে চিন্তিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন আদিবাসী হাজং গোত্রের শেফালি।”কিন্তু আমার তো পেট চালাতে হবে,” কংক্রিট মিক্সচারে পাথর ঢালতে ঢালতে স্থানীয় অহমীয়া উচ্চারণে বলেন এ নারী।অন্যান্য শ্রমিকদের মতো তিনিও ক্যাম্প বানানোর কাজে প্রতিদিন প্রায় চার ডলারের কাছাকাছি আয় করেন; তুলনামূলক দরিদ্র এলাকা হওয়ায় এ আয়কেই যথেষ্ট মনে করছেন অধিকাংশ শ্রমিক।সঠিক জন্ম তারিখ না জানা শেফালির ধারণা তার বয়স ২৬ এর কাছাকাছি। গত সপ্তাহে প্রকাশিত নাগরিকপঞ্জিতে কেন নাম নেই তাও বলতে পারছেন না তিনি।”আমাদের কোনো জন্মসনদ নেই,” বলেছেন শেফালির মা মালতি হাজং, যিনি নিজেও ক্যাম্পটির নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।আসামে যতগুলো ডিটেনশন ক্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, গোয়ালপাড়ার কাছের এ ক্যাম্পটি তার প্রথম ১০টির একটি হতে যাচ্ছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।”কাছাকাছি গ্রামগুলো থেকে প্রায় প্রতিদিনই মানুষ কাজ খুঁজতে এখানে আসছে,” বলেছেন ক্যাম্পের ভেতরে বিস্তৃত রান্নার জায়গা নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার শফিকুল হক।পাঁচ বছর আগে নয়াদিল্লিতে ক্ষমতায় বসা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ববাদী সরকার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আসামের নাগরিকপঞ্জি ঠিক করার বিপুল এ কর্মযজ্ঞে হাত দেয়।দশকের পর দশক ধরে ভারতে বসবাস করা মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু বানাতেই বিজেপি সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি সমালোচকদের।অবশ্য চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে দরিদ্র অনেক হিন্দুরও স্থান হয়নি।চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি ও লাখ লাখ মানুষকে নাগরিকহীন হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়ার এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।এর মাধ্যমে কয়েক প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করা অসংখ্য মানুষ কেবল নাগরিকত্ব ও স্বাধীনতাই হারাবে না, তারা মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হবে বলে আশঙ্কা সংগঠনটির।নাগরিক যাচাই-বাছাইয়ের এ প্রক্রিয়াকে ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।আইনের অধীনে নাগরিকত্ব প্রমাণের যেসব প্রক্রিয়া আছে, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকপঞ্জিতে নাম না থাকারাও এতদিন পেয়ে আসা সব সুযোগ অধিকার ভোগ করবেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।ডিটেনশন ক্যাম্প বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও আসামের রাজ্য সরকার কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়নি বলে রয়টার্স জানিয়েছে।চলতি বছর সরকার ডিটেনশন ক্যাম্প বানানোর যে নির্দেশনা দিয়েছিল তাতে অবৈধ অধিবাসীদের জন্য নির্মিত ভবনগুলোর চারপাশে তার দিয়ে ঘেরা অন্তত দশ ফুট উঁচু দেয়াল বানানোর কথা বলেছিল বলে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।গোয়ালপাড়ার নতুন ক্যাম্পটির চারপাশও একটি লাল রঙের সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সবুজ মাঠ আর পাহাড় ছাপিয়ে দেখা যাচ্ছে দুটি ওয়াচ টাওয়ার; পেছনে নির্মিত হচ্ছে নিরাপত্তারক্ষীদের বাসভবন।এ ক্যাম্পটিতে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে নির্মাণ শ্রমিক ও ঠিকাদাররা জানিয়েছেন।প্রাথমিকভাবে আসামের জেলগুলোতে থাকা ৯০০ অবৈধ অধিবাসীকে এই ক্যাম্পে রাখা হবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।গত বছর জেলের ওই আটক কেন্দ্রগুলোর দুটি পরিদর্শন করা ভারতের ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা বন্দিরা এমনকি দ-িত অপরাধীদের চেয়েও কম অধিকার পান’ বলে মন্তব্য করেছে।

Share.

Leave A Reply