অধিকার আদায় করে নিতে হয় : প্রধানমন্ত্রী

0

এনএনবি : নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নারী অধিকার দাও, নারীর অধিকার দাও- বলে চিৎকার করে ও বক্তব্য দিলেই হবে না। খালি আন্দোলন করলেই অধিকার আদায় হয় না। অধিকার আদায় করে নিতে হবে। সেটা আদায় করতে যোগ্যতা লাগবে। সে যোগ্যতা শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আসবে।’

সোমবার ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২১’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। শিশু ও মহিলাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরার সভাপতিত্বে শিশু একাডেমিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এতে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মেয়েদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যৎ জীবনে আদর্শ গৃহিণী, জননী ও নারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। জাতীয় সংসদে স্পীকার, সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা সব নারী। এভাবে রাজনীতিসহ বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে আসছে। অচলায়তন ভেদ করে মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে। এটি সবচেয়ে বড় সফলতা।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলছে। লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। আমাদের জাতীয় উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা নানামুখী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। নারী-পুরুষ সবাই মিলে প্রিয় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। পাকিস্তান আমলে জুডিশিয়াল সার্ভিসে মেয়েরা আসতে পারতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের সুযোগ দিয়েছেন। আমরা এসে উচ্চ আদালতেও নারীদের নিয়ে এসেছি। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ডসহ সব বাহিনীতে নারীদের অংশ নেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বিদেশি কূটনীতিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিও নারীরা হচ্ছেন। স্থানীয় সরকারে নারীদের সংরক্ষিত আসন রেখেছি। ব্যাংকের এমডি, গভর্নর, খেলাধুলাসহ সব জায়গায় নারীদের সুযোগ আছে। ’৯৬ সালে রাজশাহীতে প্রমীলা ফুটবল খেলা প্রচ- বাধার মুখে হতে পারেনি, এখন সে অবস্থা নেই।’

নারী উন্নয়নে সরকারের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারী উন্নয়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২৫ প্রণয়ন করেছি। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নিরোধ কর্মপরিকল্পনাসহ নারী সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ নিয়েছি। বাবার নামের সঙ্গে মায়ের নাম সংযুক্ত করে নারীর মর্যাদা নিশ্চিত করেছি। নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। কর্মজীবী নারী হোস্টেল করেছি। ৬৩টি শিশু দিবা যতœ কেন্দ্র করে দিয়েছি। সব জায়গায় এটি করতে নির্দেশও দিয়েছি। ৩২০০ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে নারীদের অনুদান দেয়া হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জয়িতা ফাউন্ডেশন করে দিয়েছি। আমার বাড়ি, আমার খামারের মাধ্যমে নারীরা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছি। মুজিববর্ষে গৃহহীনদের ঘর দিচ্ছি, এতে নারীকেও মালিকানা দেয়া হচ্ছে।’

নারীরা যেন নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারে, তা নিশ্চিত করতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরার পাশপাশি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া নানা উদ্যোগের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন সরকার প্রধান।

তিনি বলেন, এখন একেবারে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে যে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তার ৭৫ শতাংশ আগে মেয়েরাই পেতো। এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়েরাই পায়। এছাড়া সরকার প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও উপবৃত্তি দিচ্ছে, সেখানেও মেয়েদের অংশটাই বেশি। কারণ সমাজকে যদি আমাদের গড়ে তুলতে হয়, তাহলে শিক্ষার ক্ষেত্রেও নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে শিক্ষা দিতে হবে। আর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও আমরা বলছি যে প্রতিটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, যাতে যে কোনো কাজে মেয়েরা নিজেদের যোগ্যতা দেখাতে পারে এবং তারা কাজ করতে পারে।

শেখ হাসিনার ভাষায়, একটি সমাজের অর্ধেক যদি অকেজো থাকে, তাহলে সেই সমাজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে।

তিনি বলেন, ‘আগে ধর্মের নাম নিয়ে বা সামাজিকতার কথা বলে নারীদের ঘরে বন্ধ করে রাখার যে প্রচেষ্টা ছিল, সেই অচলায়তন ভেদ করে মেয়েরা এখন এগিয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উদ্ধৃত করে তার মেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইসলামের ইতিহাস পড়লে জানা যায় যে, মুসলমান মেয়েরাও পুরুষদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতো, অস্ত্র এগিয়ে দিতো, আহতদের সেবা শুশ্রƒষা করতো। হযরত রাসুলে করীমের (সা.) স্ত্রী হযরত আয়েশা সিদ্দিকা নিজে বক্তৃতা করতেন। দুনিয়ায় ইসলামই নারীর অধিকার দিয়েছে।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে তার সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব কীভাবে আজীবন সাহস জুগিয়ে গেছেন,অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, সেই কথাও অনুষ্ঠানে বলেন তাদের মেয়ে শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘তার নিজের জীবনের চাওয়া পাওয়া ছিলো না। একজন নারী হিসেবে স্বামীর কাছে কোনো দাবি, সেটাও ছিল না। বরং সম্পূর্ণ সংসারের দায়িত্ব আমার মা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। আমাদেরকে, অর্থাৎ তার ছেলেমেয়েদের মানুষ করা থেকে শুরু করে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জেলে থাকতেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে ছাত্রলীগ- সব দলের কার্যক্রম দেখা, আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলা- সব কিছু তিনি করতেন। পর্দার আড়ালে থেকে তিনি করেছেন। কখনো তিনি কোনো প্রচার চাননি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আমরা যেই স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার পেছনে আমার মা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবের অনেক অবদান রয়েছে এবং অনেক সময় অনেক সিদ্ধান্ত তিনি দিয়েছিলেন, যা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করেছিলো। জাতির পিতা তাকে যথেষ্ট সম্মান দিতেন এবং তার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। কাজেই যে কোনো একটা অর্জনের পেছনে একজন নারীর যে অবদান থাকে, সেটাই সব থেকে বড় কথা। তাই আমাদের এই সমাজকে যদি আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে সব থেকে বড় প্রয়োজন নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলে এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাও এ অনুষ্ঠানে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ঘাতকের দল যখন আমার মাকে গুলি করে হত্যা করে, তার আগে বলেছিল, আপনি আমাদের সাথে চলেন। আমার মা কিন্তু তাদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাননি, তাদের কাছে আকুতি করেননি এবং তাদের সাথে যেতেও চাননি। একটা কথাই বলেছিলেন, যে ‘উনাকে যেভাবে হত্যা করেছ, আমাকেও মারো। তোমাদের সাথে আমি কোথাও যাব না’।”

জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা যে থেমে গিয়েছিলো এবং বাংলাদেশ তার সকল সম্ভাবনা যে হারিয়ে ফেলেছিলো, সে কথাও বলেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আবার দেশের নারী উন্নয়ন ঘটে, নারী মুক্তি ঘটে, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। কারণ আমরা নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মিলে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই মাতৃভূমিকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো।’

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তন এ অনুষ্ঠানে সংগ্রামী পাঁচ নারীকে জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ জয়িতার’ সম্মাননা দেয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দরা।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলামসহ ঊর্ধতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

Share.

Leave A Reply